বারবার প্রস্রাব হয় কেন? কোন রোগের লক্ষণ?

 বারবার প্রস্রাব হয় কেন? কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে এবং চিকিৎসা 


বারবার প্রস্রাব হওয়ার কারণ ও কোন রোগের লক্ষণ
বারবার প্রস্রাব হওয়ার সাধারণ কারণ, রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ ও করণীয়


ভূমিকা –

বারবার প্রস্রাব হওয়া অনেকের কাছে সাধারণ সমস্যা মনে হলেও কখনো কখনো এটি শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বেশি পানি পান করা, চা-কফি খাওয়া বা কিছু ওষুধের কারণে সাময়িকভাবে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়তে পারে। আবার ডায়াবেটিস, মূত্রনালির সংক্রমণ, অতিসক্রিয় মূত্রথলি, পুরুষের প্রোস্টেটের সমস্যা কিংবা অন্যান্য শারীরিক কারণেও ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে।

বিশেষ করে দিনে বারবার প্রস্রাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত তৃষ্ণা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, তলপেটে ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, দুর্বলতা বা রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

এই প্রতিবেদনে বারবার প্রস্রাব হওয়ার সম্ভাব্য কারণ, কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে, রাতে প্রস্রাব হওয়ার কারণ এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বারবার প্রস্রাব হওয়া বলতে কী বোঝায়?

সবার প্রস্রাবের অভ্যাস একরকম নয়। একজন মানুষ দিনে কতবার প্রস্রাব করবেন তা পানি পান, আবহাওয়া, খাবার, বয়স, ওষুধ এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

তবে স্বাভাবিকের তুলনায় হঠাৎ প্রস্রাবের প্রয়োজন বেড়ে গেলে বা অল্প অল্প করে বারবার প্রস্রাব হলে তাকে ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বারবার প্রস্রাবের বেগ আসা এবং মোট প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। যেমন, মূত্রনালির সংক্রমণে অল্প অল্প করে বারবার প্রস্রাব হতে পারে। অন্যদিকে ডায়াবেটিসে মোট প্রস্রাবের পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে।

বারবার প্রস্রাব হয় কেন?

বারবার প্রস্রাব হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো—

১. বেশি পানি পান করা

স্বাভাবিকভাবেই বেশি পানি পান করলে প্রস্রাবের পরিমাণ ও প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। গরম আবহাওয়ায় বেশি পানি পান করলেও এমন হতে পারে।

তাই শুধু ঘন ঘন প্রস্রাব হচ্ছে বলেই কোনো রোগ হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

২. চা, কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়

চা, কফি, এনার্জি ড্রিংকসহ ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কিছু মানুষের প্রস্রাবের পরিমাণ ও মূত্রত্যাগের প্রবণতা বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে এসব পানীয় গ্রহণ করলে রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙতে পারে।

৩. ডায়াবেটিস

বারবার প্রস্রাব হওয়া ডায়াবেটিসের একটি পরিচিত লক্ষণ হতে পারে।

রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি হলে কিডনি অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত পিপাসা, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া বা ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গও থাকতে পারে।

তবে শুধু বারবার প্রস্রাব হলেই ডায়াবেটিস হয়েছে বলা যায় না। প্রয়োজন হলে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করতে হয়।

৪. মূত্রনালির সংক্রমণ বা UTI

মূত্রনালির সংক্রমণ হলে বারবার প্রস্রাবের বেগ আসতে পারে। অনেক সময় অল্প পরিমাণ প্রস্রাব হলেও বারবার বাথরুমে যেতে হয়।

এর সঙ্গে থাকতে পারে–

  • প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
  • তলপেটে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া
  • প্রস্রাব ঘোলা বা দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া
  • কখনো প্রস্রাবে রক্ত
  • জ্বর বা শরীর খারাপ লাগা

এ ধরনের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৫. অতিসক্রিয় মূত্রথলি

Overactive bladder বা অতিসক্রিয় মূত্রথলির ক্ষেত্রে হঠাৎ তীব্র প্রস্রাবের বেগ আসে এবং বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন হতে পারে।

কখনো প্রস্রাব ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে এবং সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

৬. পুরুষের প্রোস্টেটের সমস্যা

বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের Benign Prostatic Hyperplasia (BPH) বা প্রোস্টেট বড় হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এক্ষেত্রে–

  • বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন
  • রাতে একাধিকবার প্রস্রাব
  • প্রস্রাব শুরু হতে সময় লাগা
  • প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হওয়া
  • প্রস্রাব করার পরও পুরোপুরি খালি হয়নি মনে হওয়া
  • হঠাৎ প্রস্রাবের বেগ আসা

ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।

৭. গর্ভাবস্থা

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন এবং জরায়ুর চাপের কারণে অনেক নারীর ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে। তবে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, জ্বর বা ব্যথা থাকলে ইউরিন ইনফেকশনের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৮. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

উচ্চ রক্তচাপ বা শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু diuretic বা পানি বের করার ওষুধ প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়াতে পারে।

আপনি নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে সেটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করবেন না।

৯. রাতে বেশি তরল পান করা

ঘুমানোর ঠিক আগে বেশি পানি, চা, কফি বা অন্য তরল পান করলে রাতে প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙতে পারে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে রাতে প্রস্রাবের প্রবণতাও বাড়তে পারে। তবে নিয়মিতভাবে রাতে বারবার ঘুম ভাঙলে কারণটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

রাতে বারবার প্রস্রাব হয় কেন?

রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়াকে Nocturia বলা হয়। এর সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে—

  • ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত পানি পান
  • চা বা কফি পান
  • ডায়াবেটিস
  • মূত্রনালির সমস্যা
  • অতিসক্রিয় মূত্রথলি
  • পুরুষের প্রোস্টেটের সমস্যা
  • পা বা শরীরে অতিরিক্ত তরল জমা
  • কিছু ওষুধ
  • ঘুমের কিছু সমস্যা

রাতে নিয়মিত একাধিকবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে হলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো।

বারবার প্রস্রাবের সঙ্গে যেসব লক্ষণ থাকলে সতর্ক হবেন

শুধু প্রস্রাবের সংখ্যা নয়, সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

নিচের লক্ষণগুলো থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

  • প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
  • প্রস্রাবে রক্ত
  • তলপেটে বা কোমরে ব্যথা
  • জ্বর বা কাঁপুনি
  • অতিরিক্ত পিপাসা
  • অস্বাভাবিক দুর্বলতা
  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হওয়া
  • প্রস্রাব শুরু করতে কষ্ট হওয়া
  • প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা
  • রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া

বারবার প্রস্রাব হলে কী কী পরীক্ষা করা হতে পারে?

কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা দিতে পারেন। যেমন–

রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা

ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা যাচাই করতে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা হতে পারে।

ইউরিন পরীক্ষা

মূত্রনালির সংক্রমণ, রক্ত বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা খুঁজতে প্রস্রাব পরীক্ষা করা হতে পারে।

কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা

প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট মূল্যায়ন

লক্ষণ ও বয়স অনুযায়ী চিকিৎসক প্রোস্টেট সম্পর্কিত পরীক্ষা বা মূল্যায়নের পরামর্শ দিতে পারেন।

সব রোগীর জন্য একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়।

বারবার প্রস্রাব হলে কী করবেন?

প্রথমে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাস লক্ষ্য করুন।

১. পানি পান স্বাভাবিক রাখুন: অতিরিক্ত পানি যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি ইচ্ছাকৃতভাবে পানি খুব কমিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।

২. ক্যাফেইন কমান: চা, কফি ও এনার্জি ড্রিংক কমিয়ে দেখুন উপসর্গের পরিবর্তন হয় কি না।

৩. প্রস্রাবের অভ্যাস লিখে রাখুন: কখন কতবার প্রস্রাব হচ্ছে এবং আনুমানিক কতটা হচ্ছে তা কয়েক দিন নোট করলে চিকিৎসকের জন্য কারণ বোঝা সহজ হতে পারে।

৪. ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা করুন: অতিরিক্ত পিপাসা, ওজন কমে যাওয়া বা পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৫. নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না: প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হলেই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

বারবার প্রস্রাবের সঙ্গে জ্বর, কাঁপুনি, কোমর বা পিঠের পাশে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে দৃশ্যমান রক্ত, প্রস্রাব একেবারেই না হওয়া, তীব্র দুর্বলতা বা গুরুতর অসুস্থ লাগা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে গর্ভবতী ব্যক্তি, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা কিডনি/ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গকে অবহেলা না করাই ভালো।

গুরুত্বপূর্ণ কথা

বারবার প্রস্রাব হওয়া মানেই কিডনি নষ্ট হচ্ছে বা ডায়াবেটিস হয়েছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেক সময় বেশি পানি বা ক্যাফেইন গ্রহণের মতো সাধারণ কারণেও এটি হতে পারে।

আবার একই উপসর্গ ডায়াবেটিস, ইউরিন ইনফেকশন, অতিসক্রিয় মূত্রথলি বা প্রোস্টেটের সমস্যার মতো বিভিন্ন অবস্থার সঙ্গেও দেখা যেতে পারে। তাই উপসর্গের সঙ্গে অন্য লক্ষণ এবং ব্যক্তির বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।

উপসংহার 

বারবার প্রস্রাব হয় কেন—এর উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। বেশি পানি বা ক্যাফেইন গ্রহণ থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, ইউরিন ইনফেকশন, অতিসক্রিয় মূত্রথলি কিংবা পুরুষের প্রোস্টেটের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে।

যদি সমস্যা কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে, ক্রমশ বাড়ে অথবা এর সঙ্গে জ্বালাপোড়া, ব্যথা, রক্ত, জ্বর, অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নোট: এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।

আরও পড়ুন 


রাতে ঘুম আসেনা? জেনে নিন সহজ উপায় 


ঘন ঘন প্রস্রাবের কারন,লক্ষণ এবং চিকিৎসা 


FAQ


প্রশ্ন: দিনে কতবার প্রস্রাব করা স্বাভাবিক?

উত্তর  সবার ক্ষেত্রে একই সংখ্যা স্বাভাবিক নয়। পানি পান, খাবার, আবহাওয়া, বয়স ও অন্যান্য বিষয় অনুযায়ী প্রস্রাবের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রশ্ন: বারবার প্রস্রাব হলে কি ডায়াবেটিস হয়েছে?

উত্তর  হতে পারে, তবে শুধু এই একটি লক্ষণ দেখে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা যায় না। প্রয়োজন হলে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করতে হয়।

প্রশ্ন: রাতে বারবার প্রস্রাব কি স্বাভাবিক?

উত্তর  মাঝে মাঝে হতে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে রাতে একাধিকবার ঘুম ভাঙলে এর কারণ খুঁজে দেখা ভালো।

প্রশ্ন: প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার সঙ্গে বারবার প্রস্রাব কেন হয়?

উত্তর  মূত্রনালির সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণে এমন হতে পারে। সঠিক কারণ জানতে ইউরিন পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

প্রশ্ন: পুরুষদের বারবার প্রস্রাব কি প্রোস্টেটের লক্ষণ?

উত্তর  বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রোস্টেট বড় হলে বারবার প্রস্রাব, রাতে প্রস্রাব, দুর্বল ধারা বা প্রস্রাব শুরুতে সমস্যা হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে কারণ প্রোস্টেট নয়।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url