মোবাইল ফোনের ১০ টি ক্ষতিকর দিক
মোবাইল ফোনের ১০টি ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেনে নিই ২০২৫
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দিন দিন প্রযুক্তি উৎকর্ষের মাধ্যমে যে জিনিসটির সাথে আমরা সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত হয়ে পড়েছি, তা হলো মোবাইল ফোন। আমাদের দৈনন্দিন কাজে শুরুটাই হয় মোবাইলের এলার্মের মাধ্যমে। এবং দিন শেষ ঘুমোতে যাওয়ার সময় ও মোবাইল হয় আমাদের নিত্যসঙ্গী।
মোবাইল ফোনের খারাপ দিক
অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষতি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। একাধিক গবেষণায় ভিত্তিতে হাফিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শারীরিক এবং মানসিক নানা সমস্যা পড়ছেন ব্যবহারকারীরা। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদদের বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে মোবাইল ফোনের নানা ক্ষতিকর দিকসমূহের কথা। আসুন জেনে নেই মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর দিক গুলো কি কি।
ঘাড় ব্যাথা
- দীর্ঘ সময় মাথা ঢুকিয়ে মোবাইলে থাকার কারণে দেখা দিতে পারে ঘাড়ের ব্যথার সমস্যা। অত্যাধিক গেম আসক্তি, স্কিনের দিকে তাকিয়ে ভিডিও দেখা, সোশ্যাল মিডিয়ায় মনোযোগ বেশি দিতে গিয়ে অনেক সময় মোবাইল ব্যবহারের সঠিক দুরুত্ব এবং বটি পজিশন ঠিক রাখা সম্ভব হয় না।
- ফলে মাথা স্বাভাবিক বেশি ঝুঁকি থাকার কারণে ঘাড় ব্যথা দেখা দেয়। এজন্য যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঠিক দূরত্ব এবং বডি পজিশন ঠিক রেখে ব্যবহার করা উচিত।
চোখের জ্যোতি কমে যাওয়া
- গবেষকদের মতে এই বিষয়টি, এপিজেনেটিক্স, সম্পর্কিত বিষয়। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় চোখে খুব কাছে রেখে মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ার এক ধরনের জিনগত সমস্যা দেখা দেয়।
- চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে মোবাইল ফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের দৃষ্টিহীনতার কারণ হতে পারে। মার্কিং ম্যাকিউলার ডিজেনারেশন অ্যাসোসিয়েশন এর মতে, মোবাইলের নীলাভ কালু চোখের রেটিনার দীর্ঘস্থায় ক্ষতির মাধ্যমে অন্ধত্বের কারন হতে পারে।
- স্কিনের ফন্ট সাইজ বড় করে, চোখের থেকে অত্যন্ত ১৬ ইঞ্চি দূরে রেখে, এবং একটু পর পর ২০ সেকেন্ডের জন্য স্ক্রিন থেকে চোখ ফিরিয়ে সবুজ গাছপালা দিকে তাকানোর মাধ্যমে এই সমস্যা কমিয়ে আনার সম্ভব। আর সব সময় মোবাইল স্কিনের এস কমিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন।
কানে কম শোনা
- মোবাইলে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা, উচ্চ আওয়াজে গান শোনা এবং কানে হেডফোন রাখার মাধ্যমে দেখা দিতে পারে কানের শ্রবণ শক্তি হ্রাস হওয়ার মতো গুরুত্ব সমস্যা। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের শ্রবণশক্তি রাশের হার বর্তমান সবচেয়ে বেশি। দৈনিক ২ থেকে ৩ ঘণ্টার বেশি মোবাইল ব্যবহারকারীদের ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে আংশিক বধির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- কানে হেডফোন লাগিয়ে যত তত্ত্ব চলাফেরার প্রতিনিয়ত অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। পত্রিকার পাতা শিরোনাম হওয়া ট্রেন, বাসসহ নানা যানবাহন গত দুর্ঘটনার বিরাট সংখ্যা কানে হেডফোন লাগিয়ে চলাফেরার কারণে হচ্ছে।
অস্থি- সন্ধিগুলোর ক্ষতি
- ২০১৬ সালের ১৬ জুন, dscout, ব্লগের এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে, গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ একজন স্মার্টফোন স্কিনের ট্যাপ, ক্লিক ও সোয়াইপের পরিমাণ গড়ে ২ হাজার ৬ শ ১৭ বার এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪২৭ বার। দীর্ঘক্ষণ স্কিনের টাইপিং এর ফলে আঙ্গুলের জয়েন্ট ব্যথা হয়।
- এমনকি এর ফলে আর্থরাইটিসের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাছাড়া বসার ভঙ্গি, কাত ও কানের মাঝামাঝি ফোন রেখে কথা বলা এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি দীর্ঘক্ষণ মেসেজ টাইপিং এর কারণে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
শুক্রাণু কমে যাওয়া
- মোবাইল ফোন থেকে নির্গত হওয়ার হাই ফ্রকোয়েন্সীর ইলেক্ট্রো- ম্যাগনেটি এডিয়েশন শরীরের বিভিন্ন কোষ ও পুরুষের প্রজাতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে। মোবাইলের ক্ষতিকর তরঙ্গ শুক্রাণু ঘনত্ব কমানো ও পুরুষের বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে বলে দাবি করেছে গবেষকরা।
- ফোন ব্যবহারের পর প্যান্টের পকেটে বা জামার সাইড পকেটে রেখে দেওয়ার সময় মোবাইল যথেষ্ট উত্তপ্ত থাকার ফলে এটি অন্ডকোষের চারপাশের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ হয়। যার ফলে শুক্রাণু ক্ষতিকর হয়।
নোমোফোবিয়া
- অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে মনের মধ্যে সব সময় মোবাইল আছে কিনা,নাকি হারিয়ে গেছে এমন একটা ভয় তৈরি হয়। এই রোগের নাম নোমোফোবিয়া তথা নো মোবাইল ফোন কোরিয়া।যুক্তরাজ্যের ও ভারতের তরুণরা যথাক্রমে ৫৩ ও ২৯ শতাংশ এ রোগের শিকার।
- এছাড়াও মোবাইলের মাত্রাতিক্ত ব্যবহারের ফলে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, দৈনিক অন্যান্য কাজের উপর ও যার প্রভাব পড়তে দেখা যায়।
হঠাৎ রিংটোন শোনা
- মনের বিষন্নতা থেকে মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারকারী আরশক্তি রিংটোন বা ভাইব্রেশন বেঁচে ওঠা শব্দ শুনতে পান।অর্থাৎ তাদের কাছে মনে হয় যে, কেউ বোধহয় কল করল বা কোন নোটিফিকেশন আসলো। অথচ বাস্তবে এমন কিছু হয়নি।
- অনেক ব্যবহারকারী অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে এমন সমস্যার কথা বুঝতেও পারে না।
মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া
- দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে অনেক সময় ব্যবহারকারীর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। একই সাথে অস্থিরতা এবং অমনোযোগী বৃদ্ধি পায়। সাধারণত যখন ব্যবহারকারী সহজে এই সমস্যা উপলব্ধি করতেও পারে না।
- নিজের অজান্তেই কারো সাথে অশোভন আচরন করে ফেলেন।
চিন্তা শক্তি কমে যাওয়া
- মোবাইলে অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মানুষের তড়িৎ চিন্তা শক্তি কমে যায়। সৃজনশীল মেধা কমে যাওয়ার ফলে কোন কিছুই উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিনষ্ট হয়ে যায়। মোবাইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও নকলের আশ্রয় নেওয়ার ফলে দিন দিন দেশের মেধাবী ছাত্ররা নৈতিক অবস্থা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
- মোবাইলে গেমস ও সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি প্রতি আসক্তির ফলে শিশু কিশোরা পানাহারও দৈনন্দিন কার্যক্রমের অমনোযোগী হয়ে পড়। মার্কিন ভাইরাস বিজ্ঞানী ড. ডেভরা ডিভাস মনে করেন,মোবাইলের তরঙ্গ রশ্নি শিশুদের স্বাস্থ্য ক্ষতি কারণ হচ্ছে।
- জাপানের ডকোমো ফাউন্ডেশন পাঁচটি দেশে জরিপ করে ৭০ শতাংশ শিশু পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন তার কারণ হিসেবে মোবাইল ফোনকে দায়ী করেছে। তাই নির্দিষ্ট বয়সের আগে কোনভাবেই শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া যাবে না।
- অনেক সময় শিশু কান্না বা রাগ ভাঙতে অভিভাবকরা মোবাইল কাটুন বা গান চালিয়ে শিশুর হাতে দেয় চাপড়ো পত্তিতে কখন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
পর্নো- আসক্তি
- মোবাইল ফোন স্যুলোক হওয়ার বর্তমানে সব বয়সী মানুষের কাছে এটি সহজলভ্য হয়ে পড়েছে।বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। আকাশ সংস্কৃতির ফলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তরুনরা পর্নোগ্রাফির আসক্ত হয়ে পড়ছে।
- মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামক একটি সংগঠনের গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, রাজধানী ঢাকা ৭৭ শতাংশ স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পর্নোগ্রাফিক আসক্তি তৈরি হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে বিকৃতি যৌন ছাড়ে প্রবণতা সংখ্যা জনক হারে বেড়ে চলছে।
- ধর্ষন ও খুনের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্য এবং এর ফলস্বরূপ পর্নোগ্রাফিক আসক্তি অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মোবাইল ফোনের অন্যান্য ক্ষতিকর দিক
- শিশু-কিশোরদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধের বিনষ্ট ও মা-বাবার উপদেশ না মানার প্রতারণা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
- মোবাইলের কারণে অতিরিক্ত সেলফি তোলা বাস নামের নতুন একটি মানসিক রোগ সৃষ্টি হয়েছে।
- মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক সুবিধার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবাসিক ভবন ও ফসলি জমিতে যে টাওয়ারগুলো নির্মিত হচ্ছে, সেগুলোর ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন ফলে মানব, পাশাপাশি গাছ পাল্লা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
- স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ঘুমের সমস্যা হয় সবচেয়ে বেশি।
- আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি ওয়েবসাইটে তথ্য মতে, মোবাইল ফোন ব্রেন, মাথা,গলার, টিউমারের কারণ হতে পারে।
- দীর্ঘক্ষণ মোবাইলের ব্যবহারের স্মৃতিশক্তি ও হার্টের উপর প্রভাব ফেলতে পারে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর দিক থেকে বাঁচার উপায়
মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে বাঁচতে চোখের বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ঘুম, অফলাইন থাকা, বাস্তব জীবনে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করা, হেডফোন ব্যবহার করা এবং ফোন ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করা উচিত। এছাড়াও ডার্ক মোড ব্যবহার এবং ফোনকে কাজের পর বন্ধ রাখা যেতে পারে।
প্রয়োজন অতিরিক্ত সাউন্ডে গান না শোনা, সব সময় হেডফোন গুঁজে না থাকা, এবং দীর্ঘ সময় মোবাইলে কথা বলার প্রবণতা কমিয়ে আনা সহ সর্বোপরি সচেতনতাই হতে পারে এই কার্যকর সমাধান।
শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমানোর উপায়
শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমাতে চাইলে বই পড়া, আউটডোর খেলাধুল সৃজনশীল কাজের ব্যস্ত রাখুন, পরিবারের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটান এবং একটি সময়সীমার মধ্যে ডিভাইস ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করুন। এছাড়া, বাচ্চাদের চোখের সামনে ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন তাদের বিকল্প হিসেবে আনন্দদায়ক কাজের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।
উপসংহার
ফোন ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন এবং সেই সময়সীমা মেনে চলুন। পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের জন্য ফোনকে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখুন। বাস্তব জীবনে বিভিন্ন আনন্দ ও সামাজিক সম্পর্কের উপর মনোযোগী দিন, যা শক্তি কমাতে সাহায্য করে। বাস্তব জীবনে বিভিন্ন শখ ও কাজের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখলে মোবাইলের প্রতি মনোযোগ কমবে। এগুলো মেনে চললে মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর দিকগুলো থেকে কিছুটা হলেও বাঁচা সম্ভব।
অন্য পোস্ট
মঙ্গলবার এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত।
৫ টি ক্ষতিকর যা আপনার জীবনকে নষ্ট করতে পারে
